লকডাউন বিষয়ে গান্ধীর কাছ থেকে শিক্ষণীয়

নীরবতা, পৃথক হয়ে একাকী থাকা- ইংরেজিতে যাকে বলে ‘আইসোলেশন’, সঙ্গ পরিহার বা নিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) মানুষকে বিচ্ছিন্নতায় নিক্ষেপ করে। ভারতের রাষ্ট্রপিতা মোহন দাস, করমচাঁদ গান্ধী তাঁর সংগ্রামী জীবনের বিভিন্ন ধাপে গণকল্যাণী ও সাড়া জাগানো যেসব পন্থা অবলম্বন করেছেন তার অনেকগুলোই, বলা হয়, তাঁর চিন্তায় এসেছিল আইসোলেশনের সময়। আইসোলেশনে থাকতে গান্ধীর মাথায় আসে, ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের জন্য জনগণকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আফ্রিকায় যখন ব্যারিস্টারি করতেন তখন এবং পরে, আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসে নানা ইস্যুতে অনশন করেন গান্ধী। দুই ভূখ- মিলে মোট ১৭ বার অনশন করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে ১৫ বারই অনশন করেন ভারতে। অধিকাংশ অনশনের লক্ষ্য ছিল ভারতবাসীকে জাগিয়ে তোলা। কিছু কিছু অনশনের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি।

ইতিহাসবিদরা কেউ কেউ মহাত্মা গান্ধীকে নির্জন বসবাসকারী নেতা বলে বর্ণনা করেছেন। নির্জন অবস্থায় ইতিবাচক বহু ব্যাপার তাঁর মস্তিষ্কে ধরা দিয়েছে। তিনি যে খুবই ছোট একটা ধুতি পরে নাঙ্গা গায়ে থাকতেন তার কারণ তাঁর গুরুতর একটি ভাবনা : ‘ভারতের অধিকাংশ মানুষ কোনোমতে এক খ- কাপড়ে দিনাতিপাত করে। আমি কেন অমন কাপড়ে থাকতে পারব না।’

থ্রি-পিস স্যুটে অভ্যস্ত ব্যারিস্টার এম কে গান্ধী তাঁর ধুতির আয়তন খাটো করতে করতে প্রায় লেংটির মতো করে ফেলায় অনুরাগীরা শংকিত হলেন। বাপুজি কী রাজনীতি পরিত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করতে চলেছেন! এ রকম সংক্ষিপ্ততম বসন ‘অশোভন ব্যাপার’। এটা পরিহার করা উচিত। বললেন এক সহচর। গান্ধী বললেন, ‘আমরা যদি বিস্তর পোশাক পরি তাহলে তো গরিবদের পোশাক দিতে পারব না। আমাদের কর্তব্য হলো, আগে ওদের কাপড়ের ব্যবস্থা করা, পরে আমাদের। আগে ওদের খাওয়াতে হবে, পরে আমাদের।’

মানুষ মাত্রই কোনো না কোনোভাবে এক সময় একাকীত্ববোধ করে। তখন নির্জনতাই তার পরম আশ্রয়। দরবেশ, মুনি, ঋষি, কবি, দার্শনিকরা হঠাৎ করে নিরালায় যান এবং সৃজন করেন। গান্ধী নির্জনতায় নিজেকে সঁপে দিয়ে সাধনা করেছিলেন সত্যের, লোভ-মোহের বাইরে চলে যাওয়ার সাধনা।

নিভৃত সাধনার জন্য ১৯০৪ সালে আফ্রিকায় তপোবনসদৃশ আশ্রম গড়েছিলেন গান্ধী। মনোরম পিজাং উপত্যকার ১০০ একর জমিতে ছিল সেই আশ্রম। খুব সাদাসিধেভাবে সেখানে থাকতেন তিনি। দেশে ফেরার পরও দেখা যায়, ১৯১৫ সালে গুজরাটের কোচরব নামক স্থানে ৩৬ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন একটি আশ্রয়। কোচরব এলাকায় ছিল অসংখ্য সাপ। ভক্তরা মারতে উদ্যত হলে প্রকৃতিপ্রেমিক গান্ধী নির্দেশ দেন, একটি সাপও মারবে না। ওদের শান্তিতে থাকতে দাও।

করোনাভাইরাসের দৌরাত্ম্যে এখন নগর-শহর-গ্রাম সর্বত্র লকডাউন কবলিত। মহাত্মা গান্ধী লকডাউনে যেতেন কখন? নিজেকে তিনি ঘরবন্দী করতেন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হওয়ার জন্য। ঁতাকে লকডাউন করার জন্য ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার পুনে শহরের আগাখান প্যালেসকে ‘কারাগার’ ঘোষণা করে। ১৮টি মাস তিনি সেখানে আইসোলেশনে ছিলেন। এ সময় তাঁর ম্যালেরিয়া হয়। তখন ১৯৪৪ সালে মার্চ মাসে অবশ্য দ্রুততার সঙ্গে গান্ধীকে মুক্তি দেওয়া হয়। যাকে ইংরেজিতে বলা হয়ে থাকে ‘রিলিজড উইথ নিয়ার-কমিক হ্যাস্ট।’

গান্ধী সবচেয়ে বড় অবদান কী রেখেছেন? ব্যাপকভিত্তিক ধারণা হলো, ভারতবাসীকে ভয়মুক্ত করা। ভয় থেকে মুক্ত না হলে দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করা অসম্ভব। ১৯৩১ সালের গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে ইংল্যান্ড যান গান্ধী। ওই বৈঠকে থাকবেন রাজা পঞ্চম জর্জ। গান্ধীকে বলা হলো, এই বৈঠকের খাতিরে শরীর আবৃতকরণ পোশাক পরা উচিত। গান্ধী বলেন, ‘না। আমি দরিদ্র মানুষের, অর্ধাহারী এবং প্রায় উলঙ্গ মানুষদের প্রতিনিধি। ওদের পোশাকই আমার পোশাক।’

ভারতীয় পুরানের মহান সব ঋষিরা আইসোলেশন অবলম্বন করে শক্তি অর্জন করতেন। মিথ্যাকে বর্জনের শক্তি, দুঃখজর্জর না হওয়ার শক্তি, আনন্দকে সসীম রাখার শক্তি। গান্ধীও এরকম শক্তি ধারণের চর্চা করেছেন মনে হয়। তাই, দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট তেরংঙা জাতীয় পতাকা উঠছে, নেমে যাচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক। সেই অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অনুপস্থিত। কেন?

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্ত আর আহাজারিতে সিক্ত ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন গান্ধী দেখতেন না। দেখতেন অখ- এবং প্রীতিস্নিগ্ধ মহান ভারতের স্বপ্ন। সাম্প্রদায়িক বিভেদাত্মক চিন্তাউ™ভূত রক্ততৃষ্ণা সেই স্বপ্নকে অপমান করেছে। তাই তেরংঙা পতাকা উত্তোলনের সূচনার ক্ষণটিতে নিদ্রামগ্ন রইলেন গান্ধী।

আমরা কেউই গান্ধী হতে পারব না। তবে এটাও তো সত্যি যে, ক্রিশ্চান হওয়ার জন্য ক্রাইস্ট হওয়া লাগে না। অন্তরাকীর্ণ একাকিত্বের সঙ্গে আলাপ সম্ভবত করা যায়। তখন যা শোনা যাবে তাতেই মিলে যেতে পারে সত্যিকারের পথনির্দেশ।