যে আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া সম্ভব

করোনায় আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে চাইছে তাঁর পরিবার ও দল। কিন্তু যে আদেশ বলে তিনি জেল থেকে বের হয়েছিলেন সে অনুযায়ী তাঁর বিদেশে যাওয়ার সুযোগই নেই। কারণ যে নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়েছিল সরকার তার শর্তই হলো- তিনি বিদেশে যেতে বা বিদেশি চিকিৎসা নিতে পারবেন না।

তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, সরকার সেই শর্তটি শিথিল করলে খালেদা জিয়ার বিদেশে যেতে আইনগত কোনো বাধা থাকে না। এটা নির্ভর করছে একেবারেই সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু এখনো সরকার বিএনপি বা খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে এরকম কোনো আবেদন পাননি।

করোনাভাইরাস আক্রান্ত খালেদা জিয়া গত ২৮ এপ্রিল থেকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শ্বাসকষ্টের কারণে সোমবার (৩ মে) তাকে সিসিইউতে (করোনারি কেয়ার ইউনিট) স্থানান্তর করা হয়। ওই রাতেই তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানিয়েছে বিএনপি। দরটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার অবস্থা এখন স্থিতিশীল। তাঁর চিকিৎসা নিয়ে এখন ডাক্তারেরা যা বলেন সেই অনুযায়ী এগোনো হবে’।

দলের নেতারা বলছেন, সরকারের কাছে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার জন্য অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন আগেই করা আছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীদের একজন ও দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন বলছেন, ‘ম্যাডামকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য নেওয়া জরুরি। এখন উপায় একটিই তাহলে সরকারকে তার দেওয়া নির্বাহী আদেশ সংশোধন করে বিদেশে যাওয়ার ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করা। এখন বিদেশে পাঠাতে হলে আর তো কোনো অপশন নাই। এখানে দল বা পরিবার বা আইনজীবীদের তো করণীয় কিছু নেই। নির্বাহী আদেশ সংশোধন করলেই তাকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব’।

তিনি বলেন, ‘সরকার তো সাম্প্রতিক সময়ে অনেককে সাজা থেকে ক্ষমাও করে দিয়েছে। সেখানে খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক। তাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে দিতে সমস্যা কোথায়’।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলছেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে আদালতের জামিনের অনুরোধ জানাতে পারে। এখানে বিএনপির বা আইনজীবীদের কিছু করার নেই। কিন্তু যেহেতু নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেওয়া হয়েছে সেটি সংশোধনটাই এখন একমাত্র উপায় এবং আশা করি সরকার সেটিই করবে’।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেছেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়েছে। তবে এখন বিদেশ নিতে হলে তাঁকে আদালতে আসতে হবে বলে আমার মনে হচ্ছে। তার পরও বিষয়টি ভালোভাবে না দেখে এই মুহূর্তে বলতে পারছি না’। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গতকাল এই অভিমত দেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

তিনি আরো বলেন, ‘উনার (খালেদা জিয়া) চিকিৎসা কতটুকু প্রয়োজন, বাংলাদেশেই তাঁর চিকিৎসা সম্ভব কি-না, বাংলাদেশে কী ব্যবস্থা আছে- সব কিছু দেখেই সরকার বিবেচনা করবে। সরকার যদি প্রয়োজন মনে করে, আর আইন অনুযায়ী প্রয়োজন হয় যে আদালতে যেতে হবে, তবে আদালতে আসতে হবে। যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সরকার আসবে। সরকারই ঠিক করবে প্রয়োজন আছে কি-না। কারণ এটা সরকারি আদেশ। পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারই করণীয় নির্ধারণ করবে’।

আগেও আবেদন করা হয়েছিল বিদেশ নেওয়ার
এর আগে গত বছরের মার্চে বিদেশে চিকিৎসার জন্য মুক্তি চেয়ে স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছিল খালেদা জিয়ার পরিবার। তাঁর বোন সেলিমা ইসলাম তখন বলেছিলেন যে, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরে এই চিঠিতে আমরা লিখেছি যে, বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য আমরা পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বিদেশে নিয়ে যেতে চাইছি। সেজন্য তাঁর মুক্তি প্রয়োজন। তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার জন্য মানবিক কারণে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হোক’।

এখন বিএনপি নেতারা বলছেন ওই আবেদনের ভিত্তিতেই সরকার মুক্তির আদেশ সংশোধন করলে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব হবে।

যেসব শর্তে মুক্তি পেয়েছিলেন খালেদা জিয়া
দেশজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ ছয় মাসের জন্য নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। এরপর প্রথমে সেপ্টেম্বরে ও পরে চলতি বছরের মার্চে আবারও ছয় মাসের জন্য তাঁর মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়।

এর আগে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত, তারপর থেকে প্রথমে কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই নির্বাহী আদেশে বিশেষ শর্তে মুক্তির পর তিনি গুলশানের বাসায় ওঠেন।

শর্তগুলো ছিল
এই সময়ে তাঁর ঢাকায় নিজের বাসায় থাকতে হবে এবং তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না।

উল্লেখ্য, ঢাকায় নিজের বাসায় থাকা অবস্থাতেই গত ১১ এপ্রিল খালেদা জিয়ার করোনা শনাক্ত হয়। ২৮ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তির আগ পর্যন্ত তাকে বাড়িতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। সেখানে ১০ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর চিকিৎসার বিষয়টি দেখাশোনা করছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলতে থাকার মধ্যেই হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় গত ৩ মে তাঁকে সিসিইউয়ে (করোনারি কেয়ার ইউনিট) নেওয়া হয়।