যেভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি দখল করছে চীন

নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং স্থানীয়দের আপত্তি সত্ত্বেও পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ বেড়ে চলেছে। কেবল অবকাঠামো নয়, বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ধীরে ধীরে কব্জায় নিচ্ছে দেশটির অর্থনীতি। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কও রয়েছে।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর

২০১৫ সালে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের অবকাঠামোর উন্নয়নে এগিয়ে আসে চীন। পশ্চিম চীনের সঙ্গে দক্ষিণ পাকিস্তানের গদার বন্দরকে যুক্ত করে মহাসড়ক নির্মাণ করে৷ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসির অধীনে প্রাথমিকভাবে ৪৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা থাকলেও এখন তা ৬৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

দুই ধাপে সিপিইসি

সিপিইসির প্রথম ধাপে চীনা অর্থায়নে বিদ্যুৎ ও পরিবহণ অবকাঠামো খাতে কয়েক ডজন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় এর দ্বিতীয় ধাপ। এই ধাপে উৎপাদনক্ষমতা ও চাকরির বাজার তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়া হয়েছে।

নতুন চাকরির বাজার

এমনিতেই দেশটির অর্থনীতি ধুঁকছিল, তার ওপর করোনা মহামারিতে হাজার হাজার ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, চাকরি খুঁইয়েছেন দুই কোটির বেশি মানুষ। চীনের বিনিয়োগকে এক্ষেত্রে অনেকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। চীনা বিনিয়োগে নতুন নতুন প্রকল্প চালু হতে থাকায় অনেকেই অর্থনীতি চাঙা হওয়ার আশা করছেন।

খাইবার পাখতুনখোয়া

প্রদেশটিতে ২০০৪ ও ২০০৫ সালে ইসলামি সন্ত্রাসীদের বাড়বাড়ন্ত ছিল। বেশ কয়েটি গোষ্ঠীর সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা এবং হাক্কানি নেটওয়ার্কেরও সংযোগ ছিল। এসব কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখায়নি। সেই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছে চীন।কেবল বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো নয়, স্যানিটেশনসহ অন্য নানা প্রকল্পেও অর্থায়ন করছে দেশটি।

সিন্ধ

দক্ষিণের এই প্রদেশে চীন কেবল সিপিইসি-এর অধীনে নানা প্রকল্প বাস্তবায়নই করেনি, পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের ৪০ শতাংশ কিনে নিয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জ পাকিস্তানের হলেও সেটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা এবং প্রধান নিয়ন্ত্রক নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা রাখে চীন। গত জুনে চীনা বিনিয়োগের বিরোধিতা করা বালোচ বিদ্রোহীদের কিছু সদস্য পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে হামলা চালায়।

করাচি

বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, করাচিতে অবস্থিত পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর একটি কিনে নেয়ার পরিকল্পনা করছে চীন। পাঁচটি জেলায় পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের চুক্তি পেয়েছে চীন। এসব বিনিয়োগে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত বোধ করছেন। আওয়ামী ওয়ার্কার্স পার্টির করাচির শাখার মহাসচিব খুররাম আলী জানিয়েছেন, সিন্ধের কয়েকটি তেলক্ষেত্রে অনুসন্ধান কাজও চীনকে দেয়া হয়েছে।

বালোচিস্তান

আকারের দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বালোচিস্তান। স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছে বালোচ বিদ্রোহীদের একটি দল। বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হলেও চীন তাতে দমেনি। গদার বন্দরের পাশেই একটি বিমানবন্দর বানাচ্ছে তারা। বন্দরের পাশে চীনা অর্থায়নে তিনটি কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের বঞ্চিত করে চীনা ব্যবসায়ীরা মাছ ব্যবসাতেও বিনিয়োগ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সস্তা শ্রম এবং উচ্চ মুনাফা

গত বছর প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শতাধিক চীনা বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর পাকিস্তানে বিনিয়োগের ব্যাপারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো আরো উৎসাহী হয়ে উঠেছে। একদিকে সস্তা শ্রম এবং অন্যদিকে পশ্চিমা বিনিয়োগের অভাবে তেমন একটা প্রতিযোগিতার মুখে না পড়ায় মুনাফাও বেশি করতে পারছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে চীনা বিনিয়োগকারীদের বিশেষ কোনো সুবিধা দেয়ার অভিযোগ মানতে নারাজ দেশটির কর্তৃপক্ষ।

সূত্র: ডয়েচে ভেলে।