মোহাম্মদ নাসিম ও শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গ্রহণ

একাদশ জাতীয় সংসদের সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে আজ সর্বসম্মতভাভাবে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
স্পিকার ড.শিরীন শারমিন চৌধুরী এ শোক প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেন।
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে এই শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকাল ১৩ জুন শনিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে রাজধানীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি …রাজেউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর ২মাস ১১ দিন।
মোহাম্মদ নাসিম ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল পাবনা জেলায় (বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলা) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জাতীয় চার নেতার অন্যতম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত সহচর, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং মাতা আমেনা মনসুর। তাঁর স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ বানু। তিনি তিন পুত্র সন্তানের জনক।
মোহাম্মদ নাসিম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য। তিনি রাজনৈতিক কারণে বহুবার কারাবরণ করেছেন। মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জ-১ আসন হতে মোট ছয়বার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার পর সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপের দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ নাসিম।
১৯৯৬ সালে সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৯৭ সালের মার্চে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্বও দেওয়া হয় তাঁকে। মোহাম্মদ নাসিম একই সঙ্গে দুইটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত। পরবর্তীতে, মন্ত্রিসভায় রদবদলে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।
রাজনীতির সঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম সম্পৃক্ত হন ষাটের দশকে। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সরকারের ভুট্টা খাওয়ানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পিতা এম মনসুর আলীর সঙ্গে কারাগারে যেতে হয় মোহাম্মদ নাসিমকে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে মোহাম্মদ নাসিম যুব সম্পাদক হন। ১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালের জাতীয় সম্মেলনে তাঁকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১২, ২০১৬ ও ২০১৯ সালের জাতীয় সম্মেলনে তাঁকে বাংলাদেশ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
দেশপ্রেমিক ত্যাগী নেতা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর হাত ধরে রাজনীতিতে আসা মোহাম্মদ নাসিম আজীবন পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর জেলে থাকা অবস্থায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অপর তিন জাতীয় নেতার সাথে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পিতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ন্যায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জ্বীবিত ও অটল থেকে মোহাম্মদ নাসিম ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি বার বার রাজপথে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
পাকিস্তানের স্বৈরশাসন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকান্ডের বিচার, যুদ্ধাপরাধীসহ সকল ঘাতকের বিচারের আন্দোলন সংগ্রাম এবং বিচার কার্যকরণ প্রক্রিয়ায় মোহাম্মদ নাসিম সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। দেশের সকল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্র সৈনিক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মোহাম্মদ নাসিম সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
এছাড়া ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ গতকাল ১৩ জুন শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হার্ট এটাকজনিত কারণে রাজধানীর সম্মিলিতি সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি …রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর ৯ মাস ৫ দিন।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ১৯৪৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার মধুমতী নদীর তীরবর্তী কেকানিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধার্মিক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আলহাজ্ব শেখ মো: মতিউর রহমান এবং মাতা মরহুমা আলহাজ্ব মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুন। চার ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ গত ৭ জানুয়ারি ২০১৯ বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ খুলনার আযম খান কমার্স কলেজে প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট মুজিব বাহিনীর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর কঠিন দুর্দিনে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগকে সংগঠিত রাখতে শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে প্রতিবার আলহাজ্ব শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাঁর পক্ষে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সকল নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি নির্বাচন পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার সংসদীয় প্রতিনিধি হিসেবে সততা, নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ দীর্ঘ দিন যাবত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নসের গভর্নর, ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা বোর্ডসমূহের শিক্ষা সনদের যে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, তা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
মোহাম্মদ নাসিম ও শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন, সরকারি দলের বেগম মতিয়া চৌধুরী, হাবিবে মিল্লাত, মৃণাল কান্তি দাস, বিরোধী দলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের, জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির মোস্তফা লুতফুল্লাহ।
আলোচনা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
এরপর মোহাম্মদ নাসিম ও এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা প্রর্দশনে এক মিনিট নিরবতা পালন ও তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া।