মে’র প্রথম সপ্তাহেই ২০ লাখ ডোজ টিকা আসছে ভারত থেকে

আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই ভারতের সেরাম থেকে অক্সফোর্ডের ২০ লাখ ডোজ করোনা টিকা আসছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশকে ৫ লাখ ডোজ করোনা টিকা উপহার হিসেবে দেবে চীন সরকার। এছাড়া বৈশ্বিক উদ্যোগে ফাইজার থেকে পাওয়া যাবে আরো ১ লাখ ডোজ। অন্যদিকে, এ বছরই দেশে শুরু হচ্ছে রাশিয়ার টিকা উৎপাদন। আজ রবিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। সেই সঙ্গে তিনি ভারতের সাথে যোগাযোগ বন্ধের প্রস্তাবও দেন।

এর আগে গতকাল শনিবার ভারত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’ দিতে না পেরে এ দেশেই যৌথ উদ্যোগে ‘কোভ্যাক্সিন’ উৎপাদনের প্রস্তাব দেয়। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসংক্রান্ত একটি ‘নোট ভারবাল’ (কূটনৈতিক বার্তা) পাঠিয়েছে। কোভ্যাক্সিন ভারতীয় বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান ভারত বায়োটেক উদ্ভাবিত করোনার টিকা। ভারতে এই টিকার ‘ফেজ থ্রি ট্রায়াল’ চলছে। গত বুধবার ভারত বায়োটেক ও ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) বলেছে, এখন পর্যন্ত কোভ্যাক্সিন কভিডের বিরুদ্ধে ৭৮ শতাংশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

গত বছর কোভ্যাক্সিন উদ্ভাবনপ্রক্রিয়ার শুরুতেই ভারত বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন দেওয়ার এবং যৌথ উৎপাদনের বিষয়েও আলোচনা করেছিল। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) অনুমোদন পাওয়ায় বাংলাদেশ ওই ভ্যাকসিন আনার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিল। অন্যদিকে ভারতের নিজস্ব ভ্যাকসিন ‘কোভ্যাক্সিন’সহ চীন ও রাশিয়ার টিকাগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন না পাওয়ায় বাংলাদেশ ওই ভ্যাকসিনগুলো আনার উদ্যোগ নেয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত সপ্তাহে কালের কণ্ঠকে বলেন, টিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশের মেডিক্যাল বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা। এখন ভারতে কভিডের ব্যাপক প্রকোপের মধ্যে ভ্যাকসিনের চাহিদা বেড়েছে। ওই দেশের অনেকেই নিজেদের চাহিদা পূরণ না করে বিদেশে রপ্তানির বিরোধিতা করছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার ডাব্লিউএইচওর অনুমোদিত না হলেও চীন ও রাশিয়া থেকে ভ্যাকসিন আনার এবং বাংলাদেশে রাশিয়ার ভ্যাকসিন যৌথভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। কভিড মোকাবেলায় টিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আগামী মঙ্গলবার (২৭ এপ্রিল) ভার্চুয়াল বৈঠকে বসছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ যেহেতু এখন ডাব্লিউএইচওর অনুমোদিত নয় এমন চীনা ও রুশ টিকা আমদানি ও উৎপাদনের পথে এগোচ্ছে, এই সময়ে কয়েক মাস ধরে ঝুলে থাকা ভারতের কোভ্যাক্সিন নিয়ে প্রস্তাবটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। গতকাল ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসংক্রান্ত ‘নোট ভারবাল’ পাঠানোর মধ্য দিয়ে ওই উদ্যোগ আরো চাঙ্গা হয়েছে।

জানা গেছে, নোট ভারবালে বাংলাদেশ সরকারকে ভারত বলেছে, তারা তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য খ্যাতনামা টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বাড়িয়ে চুক্তি অনুযায়ী টিকা সরবরাহের বাধ্যবাধকতা পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ চাহিদার চাপে ভারতে টিকা উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। কাঁচামাল না পেলে চুক্তির আওতায় ভারত থেকে টিকা রপ্তানি স্থগিত থাকবে। দক্ষিণের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই পরিস্থিতিতে নিজেদেরই দেখভাল করতে হবে।

বার্তায় ভারত জানিয়েছে, গত বছর থেকে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বাংলাদেশের জনগণের জন্য নিরাপদ ও সহজলভ্য টিকা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বাংলাদেশের জনগণের টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া এর প্রতিফলন। এর পাশাপাশি আইসিডিডিআরবি ও ভারত বায়োটেক গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কোভ্যাক্সিনের ফেজ থ্রির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের চুক্তি করেছিল। তবে সেই ট্রায়াল শুরুর অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্পের তুলনায় কোভ্যাক্সিন বেশি কার্যকর, প্রায় ৮০ শতাংশ।

ভারত আরো বলেছে, আমাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে ও বেশ কয়েকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যদি কোভ্যাক্সিনের যৌথ উৎপাদন শুরু হতো, তবে আমাদের দেশে ও অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে তৈরি) ভ্যাকসিন সরবরাহ করা যেত। এতে প্রত্যেক বাংলাদেশি গর্বিত হতো। তবে সেই সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এখনো আমাদের সেই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার পথ খোলা আছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত সপ্তাহে বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শঙ্কর ‘কোভ্যাক্সিন’ নিয়েছেন।

ভারতের নতুন এই বার্তার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টিকার বিষয়ে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। কোন টিকা আনা হবে বা কোনটির অনুমোদন দেওয়া হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও কারিগরি কমিটি। নিঃসন্দেহে ভারতের এই প্রস্তাব বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ এনে দিয়েছে।