বিদায় টোকিও দেখা হবে প্যারিসে

করোনাভাইরাসের আতঙ্ক, নগরবাসীর প্রতিবাদ, আরও কত শত বিপত্তি ডিঙিয়ে শুরু হয়েছিল টোকিও অলিম্পিক। ২০৫টি দেশের ১১ হাজারেরও বেশি অ্যাথলেট নিয়ে অনুষ্ঠিত ক্রীড়াযজ্ঞ শেষ হলো গতকাল। আলোর ঝলকানি, বিদায়ের করুণ সুর, আর নতুন অলিম্পিকের হাতছানিতে টোকিওর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে পর্দা নামল ‘দ্য গ্রেটেস্ট শোন অন আর্থে’র। তিন বছর পর আইফেল টাওয়ারের শহর প্যারিসে আবার বসবে ক্রীড়াবিদদের মিলনমেলা। শুরু হবে অলিম্পিক সোনার নতুন নতুন লড়াই।

আগের কয়েকটি অলিম্পিকের সেরা তারকা উসাইন বোল্ট ও মাইকেল ফেলপস অবসর নিয়েছেন। দূরপাল্লার দৌড়ের রাজা ব্রিটিশ অ্যাথলেট মোহাম্মদ ফারাহ টোকিওতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। অনুপস্থিত ছিলেন রজার ফেদেরার, রাফায়েল নাদাল, সেরেনা উইলিয়ামসের মতো টেনিসের মহাতারকারাও। টোকিও অলিম্পিকের শুরুতে অনেকে তাই নিষ্প্রোভ আয়োজনের শঙ্কায় ছিলেন। কিন্তু উসাইন বোল্টের বিদ্যুৎ গতির ঝলক দেখিয়ে দিলেন ইতালির জ্যাকবস। জ্যামাইকান মেয়ে এলাইন থম্পসন অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে ট্রিপল জিতে চমক দেখালেন। সাইক্লিংয়ে একের পর এক বিশ্ব রেকর্ড হলো। ভারোত্তোলন, ক্যানোয়িং, স্কেটবোর্ডিংয়ে দেখা মিলল নতুন নতুন তারকার। ১৩ বছরে অলিম্পিক সোনা জিতে ইতিহাস গড়ল জাপানি মেয়ে মমিজি নিশিয়া। তারকার অভাব পূরণ  করলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাঁতারু ড্রেসেল। একাই জিতলেন পাঁচটি সোনার পদক। মেয়েদের ইভেন্টে চমক দেখালেন অস্ট্রেলিয়ার মেয়ে এমা ম্যাকিওন। সাঁতারে ৪টি সোনার পদক জিতেছেন তিনি। আর্চারিতে দক্ষিণ কোরিয়ান মেয়ে অ্যান সান ৩টি সোনা জিতে ইতিহাস গড়লেন। ম্যারাথনে বিশ্বকে চমকে দিলেন ইলিয়াড কিপচোগে। টানা দুটি অলিম্পিকে ম্যারাথনে সেরা হলেন তিনি। এর আগে কেবল ইথিওপিয়ার আবেদে কিবিলা (১৯৬০ ও ১৯৬৪) এবং পূর্ব জার্মানির ভালদামার সিয়েরপিনস্কিরই (১৯৭৬ ও ১৯৮০) এই কীর্তি আছে। আরও কত নতুন নতুন তারকার জন্ম হলো টোকিও অলিম্পিকে। জিম্যানিস্টকসে মার্কিন মেয়ে সিমোন বাইলসকে ছাপিয়ে গেলেন চীনা ষোড়শী গুয়ান চেনচেন। এমনই আরও কত নতুন নতুন ঘটনা ঘটল টোকিও অলিম্পিকে। নতুন নতুন তারকার জন্ম হলো। সুইমিংপুলে মিসি ফ্র্যাঙ্কলিন, কাতিনকা হোসজুদের অতীত ভুলিয়ে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার এমা ম্যাকিওন ও ক্যালি ম্যাকিওনরা। নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন বুনে দিলেন অনাগতদের বুকে। চীন এক বড় ধাক্কাই দিল যুক্তরাষ্ট্রকে। পদক তালিকায় ৩৯টি সোনাসহ ১১৩টি পদক নিয়ে শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ৩৮টি সোনার পদকজয়ী চীনারাও খুব বেশি পিছিয়ে ছিল না (৮৮টি পদক)।

টোকিও অলিম্পিকের সফলতা নিয়ে অনেক সংশয় ছিল। তবে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রধান থমাস বাখ বলেছিলেন, ইতিহাসের এক অন্যতম অলিম্পিকই আয়োজন করতে যাচ্ছে টোকিও। সত্যিই এক ব্যতিক্রমী অলিম্পিক আয়োজন করল টোকিও। স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছিল শূন্য। অলিম্পিকজয়ী অ্যাথলেটরা নিজেরাই গলায় ঝুলিয়েছেন নিজেদের পদক। মুখোশ পরে থাকতে হয়েছে সারাক্ষণ। কত শত নিষেধাজ্ঞা ছিল অলিম্পিক ভিলেজে! আগের মতো অ্যাথলেটদের মেলামেশাতেও ছিল নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এতকিছুর পরও অলিম্পিকের আয়োজন এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিল বিশ্ববাসীকে। এ আয়োজন উপলক্ষে মহামিলনের কেন্দ্রে এক হয়ে গিয়েছিল সাদা-কালো। মিটে গিয়েছিল ধনী-গরিবের দূরত্ব। বর্ণবাদ, ধর্মীয় মতভেদ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে গিয়ে একসুরে গান গেয়েছে পুরো বিশ্ব। টোকিও অলিম্পিক প্রমাণ করে দিল এক কেন্দ্রে এমনই মহামিলনের মাধ্যমে জয় করা যায় সব ভয়।

টোকিও অলিম্পিকের প্রধান সেইকো হাশিমতো সমাপনী অনুষ্ঠানে এমনটাই বললেন। অ্যাথলেটদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা যা অর্জন করেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অকল্পনীয় বাস্তবতাকে আপনারা মেনে নিয়েছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জগুলোতে বিজয়ী হয়েছেন। আর এটাই আপনাদেরকে সত্যিকারের অলিম্পিয়ান হিসেবে গড়ে তুলেছে।’ টোকিওতে অলিম্পিকের পর্দা নামার মুহূর্তে বাজছিল বিদায়ের করুণ সুর। অন্যদিকে প্যারিসে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। আইফেল টাওয়ারের পাদদেশে উপস্থিত হয়েছিলেন হাজার হাজার ফরাসি নাগরিক। ২০২৪ সালের অলিম্পিককে স্বাগত জানাল তারা অভিনব পন্থায়। আটটি বিমান আকাশে উড়াল দিয়ে লাল-নীল-সাদা রঙে ‘ফ্রেঞ্চ অ্যাক্রোবেটিক প্যাট্রোল’ উপহার দিল ক্রীড়াপ্রেমীদের।