‘জেগে উঠতে হবে, ঘোরতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে হবে এখনই’

‘আজ এই জাতিকে বাঁচানোর জন্য, তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসার জন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এখনই জেগে উঠতে হবে, এই ঘোরতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে উঠে দাঁড়াতে হবে।’

আজ রবিবার (৪ জুলাই) ডিইউজের আলোচনাসভায় এসব কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্যোগে ‘মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী : গণমাধ্যমের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এই ভার্চুয়াল আলোচনাসভা হয়।

গতকাল শনিবার (৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বিরুদ্ধে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, কী নির্লজ্জ একজন ব্যক্তি, পার্লামেন্টে তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর দলের লোকেরা কথা বলছেন, বিরোধী দলের কয়েকজন কথা বলছেন, সারা দেশের মানুষ কথা বলছে। তাঁদের মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি যখন প্রমাণিত হয়েছে, দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে যখন তিনি চিহ্নিত হয়েছেন, ছবি তোলা হয়েছে, অ্যাগ্রিমেন্ট সই করার সময়। তার পরও তিনি পদত্যাগ করছেন না এবং লজ্জা-শরম কোনো জিনিস আছে বলে মনে হয় না। দুর্ভাগ্য আমাদের যে এ রকম একটা ভয়ংকর গণবিরোধী সরকার, যারা আমাদের সব অর্জনগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তারা এখনো সরকারে আছে এবং বহাল তবিয়তে আছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার চরম দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এই করোনাভাইরাসে যখন মানুষের জীবন চলে যাচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য খাতে কেমন দুর্নীতি চলছে। আমরা প্রথম থেকে বলছিলাম- জেলার হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ শয্যার ব্যবস্থা করা হোক, অক্সিজেন সরবারহের ব্যবস্থা করা হোক, ওষুধের ব্যবস্থা করা হোক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শতকরা ৫২টি হাসপাতালে কোনো আইসিইউ শয্যা নেই। একটা জেলা হাসপাতালে পর্যন্ত কোনো অক্সিজেন সরবারহের ব্যবস্থা নেই।’

গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গণমাধ্যমে এতটুকু সরকারের সমালোচনা করলে তাঁদেরকে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে চরম নির্যাতন করা হচ্ছে। আমি দেখলাম, গত ছয় মাসে ১৫০ জনের মতো সাংবাদিককে শুধু সত্য কথা লেখার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মামলা করা হয়েছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলন, ‘আজ এই জাতিকে বাঁচানোর জন্য, তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসার জন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কখনো কোনো আন্দোলন সফল হবে না, যদি আমরা ত্যাগ স্বীকার না করতে পারি। আমি অনুরোধ জানাব তরুণদের- এখনই জেগে উঠতে হবে, এই ঘোরতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে উঠে দাঁড়াতে হবে।’

‘একসময়ের নামকরা সাংবাদিকরা যাঁরা এখন উচ্ছিষ্টভোগী হয়েছেন, তাঁরা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে অপপ্রচার করে কলাম লিখছেন যা সত্য নয়’ উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সেই লেখাগুলোর বিরুদ্ধে আপনাদের জবাব দিতে হবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে পত্রিকায় আপনাদের লেখা দিতে হবে। কিছুদিন আগে আবদুল গাফফার চৌধুরী সাহেব যে সমস্ত লেখা লিখেছেন, আপনারা আমাদের মতাদর্শের যারা, একজনও কিন্তু প্রতিবাদ করে কলাম লিখছেন না। অন্তত যে কথাগুলো তাঁর সত্য নয়, সেগুলো তো আপনাদের বলতে হবে, লিখতে হবে, জনগণকে জানাতে হবে সত্যটা।’

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলামের সঞ্চালনায় আলোচনাসভায় ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, বর্তমান সভাপতি এম আবদুল্লাহ, কবি আবদুল হাই শিকদার, বিএফইউজে মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ডিইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাকের হোসাইন, বাসির জামাল, রাশেদুল হক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মোরসালিন নোমানী প্রমুখ বক্তব্য দেন।

দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এখনকার সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র না থাকলে গণমাধ্যমও ভালো থাকে না। সাংবাদিকরা আজ ভালো নেই। তাঁরা খুব কষ্টের মধ্যে কাজ করছেন।’

সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের রক্ত ঝরেছে। মাহমুদুর রহমান, যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমানসহ অনেক সাংবাদিককে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। ৪২ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন বর্তমান সরকারের আমলে। বিএফইউজের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজিসহ অনেকে কারাগারে আছেন। আবুল আসাদের মতো প্রবীণ সাংবাদিককেও শুধু জেলে পোড়েনি, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। এটা ফ্যাসিজমের নিয়ম। প্রথমে তারা রাজনীতিকদের ধরেছে। এরপর এখন সাংবাদিকসহ ভিন্নমত দমন শুরু করেছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজ বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে একটা হাইব্রিড রেজিমের দেশ। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পেতে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই সরকারকে পরাজিত করে জনগণের সরকার, জনগণের সংসদ, জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে।’ তিনি বলেন, ‘আজ দেশের গণতন্ত্রের জন্য খালেদা জিয়া বন্দি জীবনযাপন করছেন। ৩৫ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা, পাঁচ শর ওপরে মানুষ গুম হয়ে গেছে, শত শত  মানুষ খুন হয়েছে। এরা কিন্তু রাজনৈতিক নেতাকর্মী। এমনকি অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা হয়েছে। তাহলে কোথায় গণতন্ত্র? আমাদের এখানে সবই আছে, এখানে সরকার আছে। জাতীয় সংসদ আছে, বুরোক্রেসি আছে, কিন্তু মানুষের অধিকার নেই।’

এই অধিকার আদায়ের জন্য গণমাধ্যমকে অতীতের মতো সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান ফখরুল।

শওকত মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলেও আমাদের দেশে গণমাধ্যমের ক্রান্তিকাল চলছে। স্বাধীনতার দীর্ঘকাল পরও আমাদের গণমাধ্যমগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে না। ক্ষমতার প্রভাববলয় থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সব কিছু। যতটুকু স্বাধীনতা দিলে ক্ষমতাবানদের সমস্যা হয় না, ততটুকুই স্বাধীনতাই ভোগ করছে সংবাদমাধ্যম। মূলত দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি এবং সুশাসনের অনুপস্থিতির কারণেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।