চৈত্রসংক্রান্তির কথা

বিশ্বজিৎ ঘোষ : বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ বাংলাদেশ। অতীতে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সমাজে নানা উপলক্ষে অনেক উৎসব বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এমন এক উৎসবের দিন হচ্ছে চৈত্রসংক্রান্তি। অভিধানে সংক্রান্তি শব্দের অর্থ দেওয়া আছে বাংলা মাসের শেষ দিন। তবে অন্য মাসগুলোতে দেখা যায় না সংক্রান্তি প্রসঙ্গ, শুধু পৌষ আর চৈত্র মাসেই সংক্রান্তি উৎসব চলে আসছে বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা, আসাম ও বিহার অঞ্চলে। চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব শতাব্দী পরম্পরায় চলে আসছে বাঙালি সমাজে। প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব চৈত্রসংক্রান্তি। তবে পাশাপাশি বসবাসের কারণে এখন মুসলিম সমাজও চৈত্রসংক্রান্তির নানা আয়োজনে অংশগ্রহণ করে থাকে। বর্তমানে চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব হয়ে উঠেছে ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন উৎসব।

ব্যক্ত হয়েছে যে বাংলা সনের প্রতিটি মাসের শেষ দিনটিকে সংক্রান্তি বলা হলেও চৈত্র মাসের সঙ্গেই সংক্রান্তি গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে। শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে এই দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপাসনা, উপবাস—এসব ক্রিয়াকর্মকে পুণ্য কাজ বলে বিশ্বাস করা হয়। ভাবা হয়, এই দিনে উপবাসব্রত পালন করা, উপাসনা করা, পূজা দেওয়া প্রভৃতি ক্রিয়াকর্ম অশেষ কল্যাণ নিয়ে আসে। অতীতে চৈত্রসংক্রান্তির দিনে হিন্দু সমাজের ঘরে ঘরে প্রভাতি পূজার আয়োজন করা হতো। পূজা শেষে শুভেচ্ছা বিনিময় ছিল একটা উল্লেখযোগ্য প্রথা। এ সময় ঘরে ঘরে নারকেল, খৈ ও চিড়ার নাড়ু তৈরি করা হয়। পূজা শেষে প্রসাদ হিসেবে এসব সামগ্রী সবাইকে খেতে দেওয়া হয়।

চৈত্রসংক্রান্তিতে হিন্দু পরিবারে নিরামিষ রান্না হয়। সারা বছরের সব গ্লানি মুছে ফেলার প্রতীক হিসেবে চৈত্রসংক্রান্তির আগেই ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা হয়। ঘরের মেঝে, বাড়ির উঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়—ঝেড়ে-পুছে সব কিছু সাজিয়ে তোলা হয়। ঘরের বিশেষ বিশেষ আসবাবে ফুলের মালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি দরজায় নিমপাতা ঝোলানো হয়—ভাবা হয় নিমের তিক্ত স্বাদে অকল্যাণ দূরে পালিয়ে যাবে। এই দিনে পাঁচ ধরনের শাক এবং তেতো সবজি রান্না করা হয়। সবজিতে সাত ধরনের আনাজ থাকে। এই মিশ্র সবজি চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান রান্না। বাড়িতে অতিথি এলেও এই মিশ্র সবজি দিয়েই তাকে আপ্যায়ন করা হয়।

চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ রকম একটি উৎসব হচ্ছে ‘জাগ পোড়ানো’। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় চৈত্রসংক্রান্তিতে এখনো ‘জাগ পোড়ানো’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। চৈত্র মাসের শেষ সকালে বা সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব। নানা ধরনের শুকনো গুল্ম ও লতাপাতা দিয়ে তৈরি করা হয় জাগ। বিভিন্ন পাড়া বা বাড়ির প্রবেশমুখে আগুন দিয়ে জ্বালানো হয় জাগ। সন্ধ্যাবেলায় জাগ পোড়ানো হলে অনেক সময় ফানুসও ওড়ানো হয়।

চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে আয়োজন করা হয় যেসব উৎসব চড়ক তার অন্যতম। বলা যেতে পারে, চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান উৎসবই চড়ক। চড়ক পূজারই একটা রূপ। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি এ উৎসবে খোলা স্থানে উঁচু করে পোঁতা গাছ থেকে, যে গাছকে চড়ক বলা হয়, বড়শি গাঁথা অবস্থায় দড়িতে ঝুলে নানা রকম শারীরিক কলাকৌশল দেখায়। এ ছাড়া এসব অনুষ্ঠানে লোকেরা শুলফোঁড়া বা বানফোঁড়া অবস্থায় নানা ধরনের দৈহিক কলাকৌশল প্রদর্শন করে। এসব খেলা খুবই ভয়ংকর ও কষ্টসাধ্য। তবু কখনো ধর্মবিশ্বাস, কখনো বা অর্থনৈতিক কারণে চৈত্রসংক্রান্তিতে এ ধরনের খেলা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বর্তমানেও চৈত্রসংক্রান্তির দিনে অনেক স্থানে চড়কের আয়োজন করা হয়। তবে আগের তুলনায় কমে এসেছে এর মাত্রা। বিষয়টিকে অমানবিক হিসেবেই অনেকে এ খেলাকে দেখে এবং এ কারণে তা বন্ধ করারও পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে।

চৈত্রসংক্রান্তির বিশেষ আয়োজন লোকমেলা। যুগ যুগ ধরে গোটা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এসব মেলায় নানা ধরনের লোকপণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়। বাঁশ, বেত, মাটি প্রভৃতি দিয়ে প্রস্তুত বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ও খেলনা চৈত্রসংক্রান্তির মেলার প্রধান আকর্ষণ। এসব মেলায় সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো—এসব চিত্তবিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। কখনো কখনো তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত এই মেলা স্থায়ী হয়, কখনো বা চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বৈশাখী মেলায় গিয়ে শেষ হয়। অতীতে চৈত্রসংক্রান্তির দিনে মেয়ে ও তার বরকে সমাদর করে বাড়িতে নিয়ে আসা হতো। নাতি-নাতনিসহ সবাই মেলায় যেত। সম্পন্ন গৃহস্থরা পরিবারের সবাইকে নতুন জামা-কাপড় দিত, নানাভাবে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠত।

চৈত্রসংক্রান্তির আরেকটি উৎসব গাজন। এটিও লোক-উৎসব। গাজন উৎসব শুরু হয় চৈত্রসংক্রান্তির দিন থেকে, আর চলে আষাঢ়ী পূর্ণিমা পর্যন্ত। গাজনের সঙ্গে বিভিন্ন পৌরাণিক বা লৌকিক দেবতার নাম সম্পৃক্ত, যেমন—শিবের গাজন, ধর্মের গাজন, নীলের গাজন ইত্যাদি। তবে গাজন উৎসবের মূল লক্ষ্য সূর্য এবং তার পত্নীরূপে কল্পিত পৃথিবীর বিয়ে। বিশ্বাসী হিন্দু গাজন উৎসবের মাধ্যমে সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিয়ে কল্পনা করে থাকে। গ্রামীণ শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে গাজন উৎসবের আয়োজন করা হয়। একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে অনুচরসহ এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যায়। পথে নানা রকম বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়—সধবা নারীরা পৌনঃপুনিক উলুধ্বনি দিতে থাকে। এ সময় শিব সম্পর্কিত গান ও লৌকিক ছড়াও পরিবেশিত হয়। গাজন মূলত কৃষিসমাজের একটি উৎসব। গাজন উৎসব সাধারণত তিন দিন ধরে চলে। গাজন উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলে লোকমেলার আয়োজন করা হয়। লোকমেলায় নানা ধরনের লোকপণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে দেখা দেয় সচলতা।

বাংলা ছাড়াও ত্রিপুরা, আসাম প্রভৃতি অঞ্চলেও চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আসামের বাঙালিরা চৈত্রসংক্রান্তির উৎসবকে বলে ‘বিহু পরব’। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে ত্রিপুরা, আসাম, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলেও গ্রামীণ মেলার আয়োজন করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব ‘বিজু উৎসব’ নামে পরিচিত। এ উৎসবে তরুণ-তরুণীরা পরস্পরের গায়ে জল ছিটিয়ে দেয়। বিজু উৎসব নৃগোষ্ঠীর মানুষের খুবই প্রিয়।

চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এক লোক-উৎসব। নানা কারণে এই উৎসব আগের মতো আর ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয় না। তবে গ্রামীণজীবনে নির্মল আনন্দ এবং লোকমেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনৈতিক সচলতার কথা বিবেচনা করলে এ উৎসবের পুনর্জীবন জরুরি বলে বিবেচনা করি।

লেখক : উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়