কৈশোরের প্রেম (৩য় পর্ব)

শিফা বাসার ভেতরে ঢুকে যাবার পরও আরো বেশ কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো শামিম। শামিম মনভরা খুশি নিয়ে বাসায় ফিরলো। এরপর মনের আনন্দে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করতে চাইল। কিন্তু যতবারই সে তার বইয়ের দিকে তাকাচ্ছিল ততবারই ফিফার হাসি মাখা মুখটা সারাটা বইয়ের পাতা জুড়ে দেখতে পাচ্ছিল। খুশিতে সেদিন সে রাতের খাবারও ভাল ভাবে খেতে পারলো না। মনের আনন্দে রাতের ঘুমও তার ঠিকমত হলো না। মাঝে মাঝেই স্বপ্নে তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। সেদিনের পর থেকে সব সময়ই শামিমের মনটা বেশ ফুর ফুরে হয়ে গিয়েছিল। যতই দিন যাচ্ছিল শামিম ও শিফার চোখাচোখি, হাসাহাসি আর মাঝে মধ্যে পড়াশুনার বিষয়ে কথোপকথনের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কয়েকদিন পরেই শিফা সাত্তার স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়া ছাত্র ছাত্রীদের গ্রুপে যোগ দিল। এতে শামিমের সাথে শিফার দেখা হওয়ায় পরিমান বেড়ে গেল। তবে শামিম ও শিফার কথোপকথনের বিষয় শুধু মাত্র লেখাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ক্লাস নাইনের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতে শামিম ও শিফা দু’জনেই ভাল পরীক্ষা দিল। পরীক্ষার বেশ কিছুদিন পর অক্টোবর মাসে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলে একটি পিকনিক কাম শিক্ষা ভ্রমণের আয়োজন করলো। স্থান নির্ধারিত হলো খুবজীপুরের বিলসাস্থ চলনবিল। যদিও স্পট সকলেরই পরিচিত তবুও একঘেয়ে ছাত্রজীবনের মাঝে কিছুটা নতুনত্ব খুঁজে পাবার আশায় ছাত্রছাত্রীরা সেখানে যাবার জন্য অত্যন্ত উন্মুখ ছিল। গুরুদাসপুর পাইলট হাই স্কুল থেকে চলনবিলের দূরত্ব প্রায় পনের কি. মি.। পিকনিকে যাবার জন্য দুটি বড় বড় কোচের ব্যবস্থা ছিল। শামিম ও শিফা দুজনেই সে পিকনিকে অংশ গ্রহণ করছে। শামিম নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘন্টা আগেই স্কুল কম্পাউন্ডে এসে অপেক্ষা করছিল। শামিমের মনের ইচ্ছে ছিল সে শিফার সাথে এক কোচে উঠে তাকে দেখতে দেখতে পিকনিকে যাবে কিন্তু তার সে আশা পূর্ণ হল না কর্তৃপক্ষের কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে। কর্তৃপক্ষ সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ছাত্ররা একটি কোচে যাবে এবং অন্য কোচে শিক্ষক ও ছাত্রীরা যাবে। এ কারণে শামিমকে বিষন্ন মনে আলাদা কোচে উঠতে হয়েছিল। পিকনিক স্পটে পৌঁছার পর চলনবিলের অপরূপ দৃশ্য দেখে সবাই বিমোহিত হয়ে পড়ল। অনেকের মনের মধ্যেই রবি ঠাকুরের সেই চরম সত্য কথাটি উঁকি দিল।
‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের ওপর
একটি শিশির বিন্দু।’

অপার আনন্দে সবাই গ্রুপে গ্রুপে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে পড়লো চলনবিলের সেই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য। পাকা রাস্তার দুধারে বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখে সবাই অবাক হলো। মনে হচ্ছিল তারা যেন সবাই সীমাহীন জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রৌদ্রের হাসিমাখা অসীম নীলাকাশ মিশে গেছে সেই বিস্তীর্ণ জলরাশির সাথে। চলনবিল গুরুদাসপুর উপজেলার একটি ঐতিহ্য। বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এ বিল দেখতে আসে। চলনবিল বাংলাদেশের ভূভাগের মধ্যে সর্ববৃহৎ বিল। রাজশাহী বিভাগের চারটি জেলা, আটটি উপজেলা, ষাটট্টি ইউনিয়ন, ১৬০০ টি গ্রাম ও চৌদ্দটি নদি নিয়ে এর বিস্তৃতি। এর মধ্যে রয়েছে ছোট বড় অনেক জলাশয়। এর দৈর্ঘ সিংড়া থেকে গুরুদাসপুরের কাছিকাটা পর্যন্ত ২৪ কি.মি. ও প্রস্থ তাড়াশ থেকে নারায়ণপুর পর্যন্ত ১৩ কি.মি.। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও পাবনার চাটমোহর উপজেলার অধিকাংশ অংশ এ বিলের মধ্যে পড়েছে। এর এক পাশে নাটোরের সিংড়া উপজেলা ও অন্যপাশে গুমানী নদি। এর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পাবনার অষ্টমণীষা, যেখানে গুমানী ও বড়াল নদি একত্রে মিশেছে। পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র গতিপথ পরিবর্তন করে যমুনা জন্মের সময় চলনবিলের উৎপত্তি। করোতোয়া ও আত্রাই নদির বিস্তৃত অংশ পরিত্যাক্ত হয়ে এ বিশাল জলাশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আত্রাই নদি এ বিলে প্রধান পানি সরবরাহকারী নদি আর বড়াল দিয়ে এ পানি সরাসরি যমুনাতে নিষ্কাশিত হয়। এ সময় এ বিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। তাই দূরে দূরে অবস্থিত গ্রামগুলো অপরূপ দেখাচ্ছিল। বিলের মাঝে ভাসমান নৌকাগুলো খব সুন্দর দেখাচ্ছিল। বিলের প্রবাহমান ঢেঊগুলোর পাড়ে আছড়ে পড়ার দৃশ্যগুলোও ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর মধুর শব্দ প্রাণের মাঝে খুশির ঢেঊ তুলছিল। এখানকার বর্ষার দৃশ্য যেমন বড়ই আকর্ষণীয় তেমনি শীতের চিত্রও মনোরম। এ সময় বিলের পানি ও আশেপাশের গ্রামে আনন্দে মেতে ওঠে পানকৌড়ি, মাছরাঙা, শালিক , বক ও বুনো কবুতরসহ অসংখ্য জাতের পাখি। তাদের কলতানে মুখরিত হয় এ বিল অঞ্চল। তখন এ বিলের দেশি পুঁটি, শোল , বোয়াল, গজার, তাকি, টেংরা, পাতাশি, খলসে , বাইম, কাকলা, চিতল ,চেলা আইকর, শিং, মাগুরসহ নানা ধরনের মাছ ধরার ধুম পড়ে যায়। এছাড়া এ সময় চলনবিল এলাকায় জম-জমাট হয়ে ওঠে ঝিনুক মুক্তার বাণিজ্য। এখানকার নারীরা ঝিনুক কুড়িয়ে তার পেট চিড়ে মুক্তা সংগ্রহ করে কারবারীদের হাতে তুলে দেয়।
আজও জনগনের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে এ এলাকা। পৌঁছার পর ছেলে মেয়ে সকলেই একত্রে ঘোরাঘুরি করার সুযোগ পেলেও শামিমের মন অনেকটাই ম্লান ছিল।
শামিম, রফিক, আসিফ, রবিন ও রায়হান পাঁচজন একত্রে এক গ্রুপে ঘোরাঘুরি করছিল। অন্যদিকে শিফা, জেসমিন, রোকেয়া ও শায়লা একত্রে ঘোরাফিরা করছিল। এ সময় শামিমকে কিছুটা উদাসীন দেখাচ্ছিল। তার লক্ষ্য ছিল শুধুই শিফার দিকে। তাই সে রফিক, আসিফ, রায়হান ও রবিনকে ম্যানেজ করে শিফাদের কাছাকাছি গেল। যতটুকু প্রত্যাশা নিয়ে শামিম শিফার কাছে গেল সেখানে পৌঁছার পর সে তার চেয়ে বেশি চমক পেল। শিফার কাছাকাছি হতেই শিফা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে বলল, তোমার মুখটা এমন শুকনো লাগছে কেন, শামিম?
সঙ্গে সঙ্গে শামিমের বুকের মধ্যে শান্তির বাতাস বয়ে গেল। তার চোখেমুখে যেন পৃথিবীর সকল হাসি আর আনন্দ এসে ভিড় করলো। শরীরের প্রতিটি কোষে নতুনভাবে সতেজতা ফিরে এলো এবং হৃদয়ের অনুভূতিতে এক পরিপূর্ণ প্রশান্তি নেমে এলো। শামিম যেন মনে মনে খুশিতে দিশেহারা হয়ে গেল। সে শিফার কথার কি উত্তর দেবে ভেবে স্থির করতে পারলো না। কিছুক্ষণ শিফার দিকে অবাক হয়ে তকিয়ে থাকলো। তারপর প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার জন্য ব্যস্ততার সাথে বলল, আমি তো একদম ঠিক আছি। এত সুন্দর পরিবেশে এসে করো মুখ মলিন থাকতে পারে? এছাড়া তোমার মত অপূর্ব সুন্দরী মেয়ের মুখ দেখলে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষের মনও মহা খুশিতে ভরে উঠবে- এটাই স্বাভাবিক।
শামিমের কথা শুনে শিফা কিছুটা লজ্জার সাথে মৃদু হাসি হাসলো। সেই সাথে তার মনের ভেতরটা যেন খুশিতে নেচে উঠলো। সে খুশির সাথে যেন চলনবিলের স্বচ্ছ পানিতেও খুশির নাচন লাগলো। শীতের হিমেল বাতাস যেন উষ্ণতা ফিরে পেল – যা শামিমের শরীরেও উষ্ণ ছোঁয়া দিয়ে গেল। এ সয়য় রফিক শামিমের কাঁধে হাল্কা করে চাপ দিয়ে বলল, চল। আমরা সমনের স্বর্ণদ্বীপটা একটু ঘুরে আসি।
রফিকের কথা শুনে শিফা অভিমানের সাথে বলল, তোমরা কী আমাদেরকে সাথে নেবেনা!
রফিক উত্তর দেবার আগেই শামিম অত্যন্ত খুশির সাথে বলল, আজ তোমরা আমাদের সারাদিনের সাথী।
শিফা আবারও অভিমান করে বলল, শুধুই আজকের জন্য…। সত্যি তোমরা আমাদেরকে বন্ধু হিসেবে এখনো পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারনি।
এই সুযোগে শামিম কিছুটা ঠাট্টার ছলে অথচ মনের গভীর থেকে ভালোবাসায় আহবান শিফার কাছে পৌঁছে দেবার উদ্দেশ্যে বলল, বিশেষ করে আমি তো চিরদিনের জন্য তোমার বন্ধু হয়ে থাকতে চাই।
শামিমের কথায় রফিক অত্যন্ত আশ্চর্যের সাথে বলল, বাব্বা! এতদূর! আমি তো তা কখনো বুঝিনি!
এ বিষয়টা নিয়ে সবাই একসাথে কিছুক্ষণ হাসাহাসি করল। তারপর তারা দল বেঁধে গন্তব্যের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। সবাই মিলে বিলের পাড়ে থেকে স্বর্ণদ্বীপ পর্যন্ত স্থাপিত কাঠের সেতু পার হয়ে দ্বীপে পৌঁছালো। সেখানে একটি ছোট্ট রেস্টুরেন্ট কাম কফি সপ রয়েছে। আসার পথে কোচের মধ্যেই সকলকে ব্রেকফাস্ট দেয়া হয়েছিল। তাই অন্য কোন কিছু খাবার ইচ্ছে কারো ছিল না। তবুও মনের খুশিতে শামিম সবাইকে লাড্ডু ও কফি খাওয়ালো। এরপর সবাই মিলে একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করে গভীর বিলের মধ্যে ঢুকে পড়লো। অনেক সময় যাবৎ তারা সারাটা বিল তন্ন তন্ন করে ঘোরাঘুরি করলো। বিভিন্ন পয়েন্টে নৌকা থামিয়ে গ্রুপ ছবি তুলল। দুপুরের লাঞ্চের আগ পর্যন্ত সবাই মনের আনন্দে সময় কাটালো। শামিম সব সময়ই শিফার পাশাপাশি অবস্থান করে মনের তৃপ্তিতে সারাটা দুপুর অতিবাহিত করলো। শিফাও শামিমের কছাকাছি থাকতেই খুব স্বাচ্ছন্দ বোধ করছিল। দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে চললো। লাঞ্চের ঠিক আগ মুহূর্তেই তারা সবাই স্টেজের কাছে পৌঁছালো। দুপুরে খাবার পর কিছু খেলা যেমন- উল্টো দৌড়, বস্তা দৌড়, হাঁড়িভাঙা, পিলো পাসিং ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হলো। পরিশেষে র‍্যাফেল ড্র ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানও হলো।
(চলবে)