করোনার মধ্যেও গুরুত্ব থাকছে পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পে

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট

রোনা মোকাবিলার যুদ্ধের পাশাপাশি সরকারের অপর একটি অংশ করছে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিতব্য বাজেট তৈরির কাজ। জানা গেছে, আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের মূল আকার দাঁড়াতে পারে সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার খসড়া প্রস্তাব ইতোমধ্যেই অনুমোদন করেছে পরিকল্পনা কমিশন। যা চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের এডিপির তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। উন্নয়ন বরাদ্দের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থ থেকে এক লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা এবং বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরায় দাঁড় করানোর কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোয়।

সূত্র জানায়, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে করোনাভাইরাস পরবর্তী অর্থনীতি মোকাবিলায় নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এতে কিছুটা হলেও পেছনে পড়বে সরকারের গত বছরের ‘আমার গ্রাম, আমার শহর” প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। তবে করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গুরুত্ব দেওয়া হবে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে। এই দুই খাতে থাকছে বিশেষ প্রণোদনা। এছাড়াও চলমান সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে দেওয়া অগ্রধিকার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তাকে দেওয়া হবে বিশেষ গুরুত্ব।

জানা গেছে, আসন্ন নতুন এডিপিতে পদ্মা সেতু ও এই সেতুতে রেলসংযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন খাতে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিবহন খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৫২ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ২৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এর পরই রয়েছে বিদ্যুৎ খাত। এই খাতে ২৬ হাজার ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট এডিপির ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাত। এই খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১২ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট অচলাবস্থায় দেশের সার্বিক অর্থনীতি একরকম স্থবির হয়ে পড়েছে। এর আঘাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাক্কলিত হিসাবে চলতি অর্থবছর শেষে জিডিপির প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে। জিডিপি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ থেকে ৩ শতাংশ।

বাজেট তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্তরা জানিয়েছেন, আসন্ন বাজেটে আগামী বছরের জন্য ব্যক্তি আয়কর সীমা কমানো হবে না। তবে করপোরেট কর হার কিছুটা কমানো হতে পারে।  নতুন করারোপ হবে না।  ঘোষণা না দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তি করা হবে। এজন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিআইডিএসের গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে জীবন আর জীবিকার দ্বিমুখী টানাপড়েনে আছি আমরা। নোভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ ও সংক্রমণ এখনও চলছে। চলমান ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ তিন মাসে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিপণন, সেই সঙ্গে রফতানি ও প্রবাসী আয়- সবদিকেই করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থায় ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে করোনাভাইরাসের প্রভাবজনিত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।’

নতুন বাজেট সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আসন্ন নতুন বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এসব প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে বাজেটে বরাদ্দ বেশি রাখা হবে। করের হার নতুন করে বাড়ানো হবে না।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায় আগামী অর্থবছরের (২০২০-২১) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) পদ্মা সেতুতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে বরাদ্দ থাকছে ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। মেট্রোরেল প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। মহেশখালী মাতারবাড়ির কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। পদ্মাসেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৬ সালে অনুমোদনের চার বছর পর বঙ্গবন্ধু রেলসেতু প্রকল্পে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে সরকারের চলমান প্রকল্পগুলোতে গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন সংস্থাগুলোর চাহিদা অনুসারেই বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। করোনার কারণে অনেকেই ব্যয় কমানোর কথা বললেও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হবে না।