করোনার এই সুযোগে যে বড় স্বার্থ হাসিল করতে মরিয়া চীন


প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। এই ভাইরাসের তাণ্ডবে অসহায় হয়ে পড়েছে আমেরিকার মতো বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রও।  এর বিষাক্ত ছোবলে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে ইউরোপের দেশ ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্স।  লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলও বিধ্বস্ত এই ভাইরাসের থাবায়।

শুধু তাই নয়, বিশ্বের ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে একযোগে তাণ্ডব চালাচ্ছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস।  এই ভাইরাসের ধ্বংসযজ্ঞে চরম অর্থনৈতিক হুমকির মুখে বিশ্ব অর্থনীতি।

বিশ্বব্যাপী এই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনে চীনের দায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য মূলত চীনকেই দায়ী করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

এমন অবস্থায় করোনাবিধ্বস্ত এই বিশ্বে বড় স্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় ব্যস্ত চীন।  আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এ নিয়ে একটি মতামতধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।  এতে বলা হয়েছে, চীন নতুন বিশ্ব শৃঙ্খলা চায় না, বরং দেশটি চায় একটি বড় স্বার্থ। আর সেটি হচ্ছে- হারানো সুনাম পুনরুদ্ধার।

এতে বলা হয়, চীন বর্তমানে এর হারানো সুনাম পুনরুদ্ধারে চরম যুদ্ধে লিপ্ত।  করোনার মহামারীর এই মহাসংকটে নিজেদের সুনাম পুনরুদ্ধার এবং হংকংয়ের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই এখন একমাত্র লক্ষ্য এই দেশটির। এ কারণে দেশটির কর্তাব্যক্তিরা বর্তমানে অগ্নিমেজাজে রয়েছেন।

তাদের এই মেজাজের পেছনে রয়েছে দুটি কারণ। প্রথমত, চীনের একটি গল্প (কাহিনী) বিশ্বব্যাপী বিক্রি করা।  আর এই গল্প হচ্ছে- করোনা ভাইরাস  মোকাবেলায় তাদের সাফল্য এবং এই মহামারীর প্রথমদিকে তাদের কৃত ভুলগুলো আড়াল করা।  দ্বিতীয়ত, তাদের প্রতি চড়াও হওয়া যারা এই বিষয় নিয়ে তাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার অধীনস্ত কর্মকর্তাদের ওপর এই যুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছেন। যখন যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়ত চীনের সমালোচনা করছে এবং দিন দিন বিশ্ব এই সংকটের মধ্যে আরও নিমজ্জিত হচ্ছে, তখন শি জিনপিং নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বড় অভিযানে নেমেছেন।  এই সুযোগে গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চান তিনি।  এজন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা যেমন- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত তিনি। তার এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে  একটি মতাদর্শ, সেটি হচ্ছে- “মানবতার উন্নয়নে গোটা বিশ্ব এক সম্প্রদায়ে পরিণত হওয়া”। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন ভাগাভাগি করে নেওয়া।

এই পরিকল্পনা শি জিনপিং সর্বপ্রথম ২০১৩ সালে উপস্থাপন করেন। এর দুই বছর পর এটি জাতিসংঘেও তুলে ধরেন তিনি।  তার এই ধারণা দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং আলোচনায় উঠে আসে।  এর মাধ্যমে তিনি সকল পক্ষের লাভ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এটি মূলত পুরোপুরি অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছ একটি ধারণা।  এর মধ্যে নতুন বিশ্বশৃঙ্খলা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও কার্যপ্রণালী এবং কর্মপরিকল্পনা নেই।

এখানেই মূল পয়েন্ট।  তাদের এই ধারণার বিপরীতে গিয়ে ভাবলে দেখা যায়, চীন সব সময় বলে তারা বিশ্ব কর্তৃত্ব হাতিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুই করছে না। আমাদের ভাবা উচিত, তাহলে চীন কেন বিশ্ব শৃঙ্খলার মতো সমস্যার মধ্যে নিজেকে জড়াচ্ছে, যা তারা খুব সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতো। এর মূল কারণ হচ্ছে, এর বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে এই চীন।

এজন্য চীন কৌশলে পশ্চিমা-বিশ্ব পরিচালিত বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী নিজেদের স্বার্থ এবং প্রভাব পোক্ত করেছে চীন। যদিও বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) এখনও বড় নিয়ন্ত্রণ হাসিলের জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছে চীন, তবে এরই মধ্যে জাতিসংঘের প্রধান চারটি সংস্থায় নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।  এর মাধ্যমে তারা বিশ্বনীতি ও মান নির্ধারণ ব্যাপক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এমনকি এই বছর বিশ্ব বুদ্ধিজীবী সম্পত্তি সংস্থা (ওয়ার্ল্ড ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি সংস্থা) নিজেদের কবজায় আনতে যাচ্ছে দেশটি।

আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, এরই মধ্যে জাতিসংঘে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক দাতা দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে চীন।  এর মাধ্যমে গত কয়েক বছর ধরে তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোয় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্ব থেকে নিজেদের দায়িত্বে শিথিলতা দেখাবে, সেই সুযোগটি তৎক্ষণাৎ ধরে নেবে চীন। মহামারীর দ্বারা ক্লান্ত ও দারিদ্রের মুখে পতিত হওয়া এই বিশ্বে এটিই সবচেয়ে বড় সুযোগ।  এখন যেই এই সুযোগ নেবে সেই ভাল অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ব উন্নয়ন ও স্থিতিলতায় নেতৃত্ব দেওয়া চীনের উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে অধিকাংশ দেশে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

এই জন্য করোনা সংকটকে মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিয়েছে চীন।  এই মহামারীর সুযোগেই চীন খুব অল্প সময়ে তাদের সেই স্বার্থ হাসিল করতে পারবে।  তবে এটাও সত্য, এর মাধ্যমে পশ্চিমাদের অনেকে ত্রুটিও প্রকাশ্যে এসেছে।  এই সংকটে প্রমাণ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো রাজনেতিক সমস্যা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত নয়।  আর এ কারণেই তারা এই ভাইরাসের মোকাবেলায় বিপর্যস্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সৃষ্ট বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোও চলছে উদ্দেশ্যহীনভাবে।  বাকি বিশ্বকে নিজেদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে চীন। করোনার এই দুঃসময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেডিকেল সরঞ্জামসহ বিভিন্ন অনুদান দিয়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই চীনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।  এক্ষেত্রে অনেকেটাই পিছিয়ে পড়েছে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান দেশগুলো।