একুশের গ্রন্থমেলা এবার আরো বিস্তৃত পরিসরে

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতাস্তম্ভ ঘিরে বিশাল পরিসরজুড়ে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন। করোনা মহামারির কারণে দেড় মাস পিছিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) শুরু হচ্ছে একুশে গ্রন্থমেলা। মহামারি পরিস্থিতি মাথায় রেখে এবার মেলার আয়োজন হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। ভিড় এড়াতে স্টলের সামনে যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা এবং এক স্টল থেকে আরেক স্টলের দূরত্ব বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে এবার মেলার পরিসর গত বছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। এবার প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট আয়তনে বিস্তৃত হচ্ছে গ্রন্থমেলা। গত বছর গ্রন্থমেলার আয়তন ছিল আট লাখ বর্গফুট।

লটারি করে কয়েক দিন আগেই প্রকাশকদের স্টল ও প্যাভিলিয়ন বুঝিয়ে দিয়েছে মেলার কর্তৃপক্ষ বাংলা একাডেমি। এখন মেলার মাঠে পুরোদমে চলছে স্টল নির্মাণ ও সজ্জার কাজ। গতকাল শনিবার মেলার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে স্টল ও প্যাভিলিয়নের কাঠামো। স্টল ও প্যাভিলিয়নের এসব কাঠামো নির্মাণে ভীষণ ব্যস্ত কারিগররা। আগামী বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মেলার উদ্বোধন করবেন। এবার মেলা চলবে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত।

গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উত্তর ও পূর্ব দিকের অংশে এবার বেড়েছে মেলার পরিসর। ফলে প্রথমবারের মতো মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশে রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে থাকছে এবার নতুন একটি প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ। থাকছে স্বাধীনতাস্তম্ভের প্রবেশপথ দিয়ে প্রবেশ করে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও। উদ্যানে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটক ও বাংলা একাডেমির বিপরীত পাশ দিয়ে দুটি করে পথ থাকবে আগের মতো।

এবার প্রথমবারের মতো ঝড়-বৃষ্টি ও গরমের মৌসুম মার্চ-এপ্রিলে গ্রন্থমেলা হওয়ায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মেলা প্রাঙ্গণে বৃষ্টির সময় বইপ্রেমীদের আশ্রয় নিতে চারটি শেড নির্মাণ করা হচ্ছে। থাকছে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও। বৃষ্টি বা ঝড় না থাকলে এই শেডগুলো মোড়ক উন্মোচন ও লেখকদের আড্ডার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ঝড়-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে এবার প্রকাশনা সংস্থাগুলোর স্টলের ওপর ত্রিপলের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে টিনের ছাউনি।

বাংলা একাডেমির পরিচালক এবং মেলা আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ জানান, মেলার সব প্রবেশপথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা হবে। আর মেলায় প্রবেশ করতে হলে সব দর্শনার্থীকে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে এবারের মেলার থিম হচ্ছে ‘স্বাধীনতা’। গ্রন্থমেলার সামগ্রিক সৌন্দর্য, বিন্যাস ও প্রকাশনায় থাকবে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর আবহ। স্বাধীনতার পাঁচটি দশককে পাঁচটি আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে মেলায়, যাতে দর্শনার্থীরা গ্রন্থমেলায় এসে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারে। এ ছাড়া স্বাধীনতাস্তম্ভের চারপাশে বর্ণমালা দিয়ে নির্মাণ করা হবে হরফ স্থাপনা। থাকছে স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

এবারও মেলা মাঠের সার্বিক নকশা করেছেন স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর। তিনি বলেন, ‘এবার একুশে গ্রন্থমেলা হচ্ছে স্বাধীনতার মাসে। মার্চ মাসে মেলা করা, আবার করোনার কারণে সব ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসব কারণে স্বাধীনতাস্তম্ভকে কেন্দ্র করে কিছু করার চেষ্টা করেছি। মানুষ মেলার যে প্রান্তেই যাক, ঘুরেফিরে স্তম্ভটা চোখে পড়বেই।’

তিনি আরো বলেন, “এবারের থিম ‘স্বাধীনতা’ মাথায় রেখে স্বপ্ন, চিন্তা, চেষ্টা, চর্চা ও অর্জন—এই পাঁচটি বিষয় নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। কারণ গত ৫০ বছরে আমরা কী ধরনের স্বপ্ন, চেষ্টা, চিন্তা, চর্চা, অর্জন করেছি সেটা জানার একটা প্রয়াস চালিয়েছি।”

মেলায় এবার ৫২২টি প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান স্টল বরাদ্দ পেয়েছে। স্টলের মোট ইউনিট সংখ্যা ৮১৭। বাংলা একাডেমিসহ মোট প্যাভিলিয়ন থাকছে ৩৩টি।

এবারও শিশু চত্বর থাকছে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। শুক্র ও শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত থাকছে ‘শিশু প্রহর’। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল মেলা অংশে থাকছে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে এবার থাকবে দুটি ফুডকোর্ট। প্রতিটিতে থাকছে ১০টি করে স্টল।

বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে থাকছে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিদিনই থাকবে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ।

প্রতিদিন বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে মেলা। আর ছুটির দিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে।