উপশাখায় ঝুঁকছে ব্যাংক, দোরগোড়ায় সেবা

সাধারণ মানুষের কাছে আশীর্বাদ হয়ে এলো ব্যাংকের উপশাখা। স্থানীয় হাটবাজার বা বাড়ির কাছে ব্যাংকের স্থাপিত এসব উপশাখায় ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, আমানত রাখা, ঋণসুবিধা, ইউটিলিটি বিল জমাসহ সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিদিনই বাড়ছে নতুন গ্রাহক, আমানত ও ঋণ বিতরণের পরিমাণ। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা খরচ কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোও উপশাখা স্থাপনে দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে। ব্যাংকাররা বলছেন, উপশাখার মাধ্যমে কম খরচে আর্থিক সেবার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আবার গ্রাহকদের ওপর কোনো ধরনের বাড়তি ফি বা চার্জ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে উপশাখার সেবা দিন দিন প্রসার ও জনপ্রিয় হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আর্থিক সেবার বাইরে থাকা মানুষকে ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে উপশাখা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমেও মানুষের দোরগোড়ায় যাচ্ছে ব্যাংকিং সেবা। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হচ্ছে। কর্মসংস্থানও বাড়ছে।

উপশাখা হলো ব্যাংকের শাখার আদলে ছোট পরিসরের ব্যবসাকেন্দ্র, যা আগে ব্যাংকিং বুথ নামে পরিচিত ছিল। এটি নিকটবর্তী কোনো শাখার অধীনে পরিচালিত হয়। উপশাখায় সর্বোচ্চ ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। তবে কোনো কোনো উপশাখা দুই-তিনজন কর্মকর্তাও চালাচ্ছেন। কম লোকবল ও সাজসজ্জার কারণে খরচও কম। এর ফলে ব্যাংকগুলো উপশাখা স্থাপনে দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে। উপশাখায় বৈদেশিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছাড়া ব্যাংকের সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্তমানে উপজেলা ও থানাপর্যায়ে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা রয়েছে। তবে উপজেলা ও থানাপর্যায়ে ব্যাংকের শাখা থাকলেও তা সাধারণত উপজেলা বা থানার হেড কোয়ার্টার অথবা প্রধান ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ফলে ওই উপজেলার দূরবর্তী অঞ্চলের লোকজন ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ ১০-২০ কিলোমিটার দূর থেকে ব্যাংকে যাওয়া সব সময় সব মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। এ সমস্যা সমাধানে উপশাখা ব্যাংকিং এখন কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।

বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা একটি শাখা খুলে যে বেনিফিট পাই, মোটামুটি একই রকম বেনিফিট উপশাখা খুলেও পাচ্ছি। এর মাধ্যমে কম খরচে ব্যাংকের নেটওয়ার্কও বিস্তৃত করা সম্ভব হচ্ছে। আবার শাখার মতো প্রায় সব ধরনের সেবা পাওয়ায় গ্রাহকদের জন্যও সুবিধা হচ্ছে। তাঁদের সরাসরি ব্যাংকের সেবা নেওয়ার জন্য বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও ত্বরান্বিত হচ্ছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের পক্ষে সব জায়গায় শাখা খোলা সম্ভব না। আবার সব জায়গায় খুললে লাভের মুখ দেখতে পারবে কি না সেটিও বড় বিষয়। তাই যেসব জায়গায় ব্যাংক শাখা দিতে পারছে না বা শাখা খোলা অলাভজনক, কিন্তু জনগণকে ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন ওই সব এলাকার মানুষকে আর্থিক সেবায় আনার ক্ষেত্রে উপশাখা ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোও মানুষের আরো দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানও বাড়ছে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকিং বুথ স্থাপনসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয়, ব্যাংকিং বুথের আয়তন হবে এক হাজার বর্গফুটের মধ্যে। এর পরই ব্যাংকগুলো বুথ স্থাপন জোরদার করে। আর গত ডিসেম্বরে ব্যাংকিং বুথের নাম পাল্টে উপশাখা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপশাখায় সব রকম ব্যাংক হিসাব খোলা, নগদ টাকা জমা ও উত্তোলন, চেকবই ও পে অর্ডার ইস্যু, ক্লিয়ারিং চেক ও পে অর্ডার জমা, আমানত ও ঋণসুবিধা, রিয়েল টাইম অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা, ইউটিলিটি বিল জমাসহ সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা হয়। ব্যাংকের গ্রাহক ভিত্তি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা, ব্যাংকিং আওতাবহির্ভূত এলাকার জনগণের নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ সৃষ্টি, বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অর্থ সহজে ও দ্রুততম সময়ে সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো, দেশব্যাপী জনগণের অর্থের প্রবাহকে সহজতর ও ঝুঁকিমুক্ত করা, পশ্চাৎপদ এলাকার অর্থায়নের মাধ্যমে স্থানীয়পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আধুনিক

ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াও উপশাখার অন্যতম কাজ হিসেবে বিবেচিত বলেও জানান তাঁরা।

রাজধানীর সবুজবাগ থানার মাদারটেকের বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম। তাঁর বাসার কাছেই উপশাখা খুলেছে সাউথইস্ট ব্যাংক। ফখরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বাসার কাছাকাছি হওয়ায় উপশাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলেছি। কোনো ঝামেলা ছাড়াই প্রতি মাসেই সঞ্চয়ের টাকা জমা করি। এতে আমার সময় যেমন বেঁচে যায়, তেমনি কোনো যাতায়াত খরচও লাগে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ৩৭টি ব্যাংক উপশাখা খোলার অনুমতি নিয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি ব্যাংক সারা দেশে প্রায় এক হাজার ২৭৫টি উপশাখা চালু করেছে। সবচেয়ে বেশি উপশাখা খুলেছে নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। ব্যাংকটি সারা দেশে ৩২৮টি উপশাখা খুলেছে। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুখতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, উপশাখার ধারণাটি আগে ছিল না। এক-দুই বছর আগে এটা খোলার পারমিশন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে কম খরচে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে পারছে ব্যাংকগুলো। ফলে লোকেশন বেশি কভার করা যাচ্ছে। এতে গ্রাহকদেরও সুবিধা হচ্ছে।

তিনি বলেন, উপশাখা থেকে প্রান্তিক কৃষক, খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি উপকৃত হচ্ছেন। কারণ তাঁরা উপশাখা থেকে সহজেই ঋণ নিতে পারছেন। শাখার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত না থাকায় বা নেটওয়ার্কে কভার না করায় বেসরকারি ব্যাংকগুলো সরাসরি প্রান্তিক কৃষকের কাছে ঋণ বিতরণ করতে পারত না। কিন্তু উপশাখার কল্যাণে সেটি সম্ভব হচ্ছে। তাঁর মতে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের তুলনায় উপশাখার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ উপশাখার মাধ্যমে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক ব্যাংকের সব সেবা পাওয়া সম্ভব, যা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব না।

এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পর সবচেয়ে বেশি উপশাখা খুলেছে আইএফআইসি ব্যাংক। ব্যাংকটি ৩০১টি উপশাখা খুলেছে। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৮২টি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৫৯টি, এক্সিম ব্যাংক ৫৪টি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫৪টি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৪০টি, যমুনা ব্যাংক ৩৮, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ৩২টি, ওয়ান ব্যাংক ২৪টি, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ১৯, ঢাকা ব্যাংক ১৬টি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১৪, প্রিমিয়ার ১২টি, এনআরবি গ্লোবাল ১২টি, আল-আরাফাহ ১১টি, ডাচ্-বাংলা ১০টি, এনসিসি ৯টি, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট ব্যাংক ও মিডল্যান্ড ব্যাংক ৮টি করে, ইউনিয়ন ব্যাংক ৬টি, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ৫টি, ইস্টার্ন ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক ৩টি করে এবং উত্তরা ব্যাংক ২টি উপশাখা খুলেছে। এর বাইরে সোনালী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও মধুমতি ব্যাংক ১টি করে উপশাখা খুলেছে।